গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি কলকাতার ইতিহাসে ‘গোপাল পাঁঠা’ নামেই বেশি পরিচিত, আধুনিক ভারতের ইতিহাসের এক অত্যন্ত বিতর্কিত ও আলোচিত চরিত্র। ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় সংঘটিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ (The Great Calcutta Killing)-এর সময় হিন্দু প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় স্থান দিয়েছে। একপক্ষের কাছে তিনি ছিলেন ‘ত্রাতা’ বা বীর, আর অন্যপক্ষের কাছে তিনি ছিলেন একজন ‘দাঙ্গাবাজ’ বা ‘গুণ্ডা’। তবে বিতর্ক যাই থাক না কেন, ১৯৪৬ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে কলকাতার ভাগ্যনির্ধারণে তাঁর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
নিচে তাঁর জীবন, পটভূমি এবং ইতিহাসের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকার একটি বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো।
১. জন্ম, বংশপরিচয় ও প্রারম্ভিক জীবন
গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৩ সালে কলকাতার বউবাজার অঞ্চলের মলঙ্গা লেন এলাকায় একটি ঐতিহ্যবাহী ও সচ্ছল কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে। তাঁর পরিবার কলকাতায় বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।
পারিবারিক পটভূমি
গোপালচন্দ্রের ঠাকুরদাদা অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার একজন অত্যন্ত নামকরা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তবে গোপালচন্দ্রের নামের সাথে ‘পাঁঠা’ শব্দটি যুক্ত হওয়ার পেছনে কোনো জাতিগত বা পেশাগত অসম্মানজনক কারণ ছিল না, বরং এটি ছিল সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট এবং বউবাজার সংলগ্ন এলাকায় তাঁদের একটি মাংসের দোকান ছিল। পারিবারিক এই ব্যবসার সূত্র ধরেই স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভালোবেসে বা চিনে রাখার জন্য ‘গোপাল পাঁঠা’ বলে ডাকতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এই নামটাই তাঁর আসল নামের চেয়ে বেশি পরিচিতি পায়।
শৈশব ও শারীরিক গঠন
ছোটবেলা থেকেই গোপাল প্রথাগত পড়াশোনার চেয়ে শারীরিক কসরত, কুস্তি এবং লাঠিখেলায় বেশি আগ্রহী ছিলেন। বউবাজার ও মধ্য কলকাতার বিভিন্ন আখড়ায় তিনি নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সে যুগে কলকাতার যুবকদের মধ্যে শরীরচর্চা এবং আত্মরক্ষার পাঠ নেওয়ার একটি ব্যাপক চল ছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের প্রস্তুত করা। গোপালচন্দ্রও সেই পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন। তিনি সুঠাম দেহ এবং অসীম সাহসের অধিকারী ছিলেন, যা তাঁকে অল্প বয়সেই স্থানীয় যুবকদের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।
২. সামাজিক কর্মকাণ্ড ও ‘ভারত জাতীয় বাহিনী’ গঠন
গোপালচন্দ্র কেবল একজন ব্যবসায়ী বা কুস্তিগির ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজসেবকও। স্থানীয় স্তরে যেকোনো মানুষের বিপদে-আপদে তিনি সবার আগে এগিয়ে যেতেন। গরিব দুঃখীদের সাহায্য করা, পাড়ার মেয়েদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় উৎসবে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে মধ্য কলকাতায় তাঁর একটি নিজস্ব অনুগামী দল তৈরি হয়েছিল।
ভারত জাতীয় বাহিনী (Bharat Jatiya Bahini)
১৯৪০-এর দশকের প্রথমার্ধেই গোপালচন্দ্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মুসলিম লীগের ‘পাকিস্তান’ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দানা বাঁধছিল। এই পরিস্থিতিতে নিজের এলাকা এবং সম্প্রদায়ের সুরক্ষার জন্য তিনি ‘ভারত জাতীয় বাহিনী’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তোলেন।
এই সংগঠনে স্থানীয় হিন্দু যুবক, কুস্তিগির এবং কসাইখানার শ্রমিকরা যোগ দেন। গোপাল তাঁদের লাঠিখেলা, ছোরা চালানো এবং আত্মরক্ষার বিভিন্ন কৌশল শেখাতেন। এটি কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না, বরং ছিল একটি আধা-সামরিক সুরক্ষামঞ্চ। এই বাহিনীই পরবর্তীকালে ১৯৪৬ সালের দাঙ্গায় কলকাতার হিন্দুদের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছিল।
৩. পটভূমি: ১৯৪৬ সালের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’
গোপাল পাঁঠার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৪৬ সালের আগস্ট মাসে। এই সময়টিকে না জানলে তাঁর জীবনী অপূর্ণ থেকে যাবে।
| ইভেন্ট | বিবরণ |
| মুসলিম লীগের দাবি | জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ পৃথক পাকিস্তানের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকার বর্জন করে। |
| ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে | ১৬ আগস্ট ১৯৪৬ তারিখটিকে লীগ ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। |
| তৎকালীন সরকার | বাংলায় তখন মুখ্যমন্ত্রী (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) ছিলেন মুসলিম লীগের এইচ. এস. সুহরাওয়ার্দী। |
১৬ আগস্ট সকাল থেকেই কলকাতার পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। গঙ্গার ওপাড় থেকে এবং কলকাতার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লীগের বিশাল মিছিল ময়দানের দিকে আসতে থাকে। দুপুরের পর থেকেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ডিক্লারেশন ও উত্তপ্ত ভাষণের পর কলকাতার বুকে শুরু হয় ভয়াবহ হিন্দু নিধন যজ্ঞ। বউবাজার, রাজাবাজার, পার্ক সার্কাস, এবং মেটিয়াবুরুজের মতো এলাকায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, নারীদের ওপর অত্যাচার করা হয় এবং অগণিত মানুষকে হত্যা করা হয়। পুলিশ প্রশাসন তখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল, বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে যে পুলিশ দাঙ্গাবাজদের পরোক্ষ সহযোগিতা করছিল।
৪. প্রতিরোধে গোপাল পাঁঠা: ইতিহাসের সেই ৭২ ঘণ্টা
১৬ এবং ১৭ আগস্ট—এই দুদিন কলকাতায় একতরফা হত্যাকাণ্ড চলে। হিন্দুরা তখন সম্পূর্ণ দিশেহারা এবং নেতৃত্বহীন। এই চরম সংকটের মুহূর্তে কলকাতার বুক চিরে দাঁড়িয়েছিলেন গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
‘রক্তের বদলে রক্ত’ নীতি
১৭ আগস্ট রাতে গোপালচন্দ্র তাঁর ‘ভারত জাতীয় বাহিনী’র সদস্যদের ডেকে পাঠান। তিনি পরিষ্কার ভাষায় নির্দেশ দেন:
“যদি কেউ আমাদের ওপর আক্রমণ করতে আসে, তবে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে না। একটি আঘাতের বদলে দশটি আঘাত ফিরিয়ে দিতে হবে।”
গোপাল পাঁঠা তাঁর দলের কসাই ও যুবকদের সংগঠিত করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর সাথে যোগাযোগ হয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী সমাজ এবং অন্যান্য প্রভাবশালী হিন্দু নেতাদের, যাঁরা এই প্রতিরোধে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ও অস্ত্র সাহায্য জোগান। গোপালচন্দ্রের নির্দেশে বন্দুক, পিস্তল, তরবারি, অ্যাসিড বাল্ব এবং হাতবোমা জোগাড় করা হয়।
পাল্টা প্রতিরোধ এবং মোড় ঘোরা
১৮ আগস্ট থেকে কলকাতার চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। গোপাল পাঁঠার নেতৃত্বে ভারত জাতীয় বাহিনী মধ্য কলকাতা, বউবাজার, কলেজ স্ট্রিট এবং উত্তর কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দাঙ্গাবাজরা যেখানেই আক্রমণ করতে আসছিল, সেখানেই গোপালচন্দ্রের বাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
গোপালচন্দ্রের এই রণকৌশল এবং সাহসিকতা দেখে কলকাতার অন্যান্য সাধারণ হিন্দু ও শিখ সম্প্রদায়ও (বিশেষ করে কলকাতার শিখ ট্যাক্সি চালকরা) প্রতিরোধে যোগ দেয়। ১৮ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে কলকাতার দাঙ্গার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। যে দাঙ্গাবাজরা হিন্দুদের নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে নেমেছিল, তারা এবার নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
৫. মহাত্মা গান্ধী এবং গোপাল পাঁঠার ঐতিহাসিক সংঘাত
কলকাতার দাঙ্গার তীব্রতা যখন মুসলিম লীগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পাল্টা আঘাতের ফলে তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে থাকে, তখন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সুহরাওয়ার্দী ও অন্যান্য নেতারা পিছু হটেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে বাংলায় আসেন মহাত্মা গান্ধী। তিনি বেলেঘাটায় অবস্থান করেন এবং উভয় পক্ষকে অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান।
গান্ধীর শান্তি মিশন ও গোপালচন্দ্রের শর্ত
গান্ধীজির আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেক সাধারণ মানুষ এবং কিছু নেতা অস্ত্র জমা দিলেও গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রথম দিকে অস্ত্র জমা দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। গান্ধীজি তাঁর অনুগামীদের পাঠিয়ে গোপালকে অস্ত্র সমর্পণের অনুরোধ করেন। তখন গোপালচন্দ্র গান্ধীজির প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে একটি ঐতিহাসিক বার্তা দিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন:
“আমি একজন কসাই। আমার সম্প্রদায়ের মা-বোনদের যখন ধর্ষণ করা হচ্ছিল, শিশুদের যখন দেওয়ালে আছড়ে মারা হচ্ছিল, তখন আপনার অহিংসা কোথায় ছিল? আমি আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র তুলেছি, কোনো নিরীহ মানুষকে মারার জন্য নয়। আমি অস্ত্র জমা দেব না, কারণ এই অস্ত্রই আমার এলাকার মানুষের সুরক্ষার একমাত্র গ্যারান্টি।”
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, যদি ওপার থেকে বা অন্য সম্প্রদায় থেকে আশ্বস্ত করা হয় যে তারা আর কোনো হিন্দু নারীর গায়ে হাত দেবে না এবং সম্পূর্ণ অস্ত্র ত্যাগ করবে, তবেই তিনি অস্ত্র ত্যাগ করবেন, তার আগে নয়।
পরবর্তীকালে, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এলে এবং হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পর, কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে তিনি প্রতীকী হিসেবে কিছু ভাঙা ও অকেজো অস্ত্র গান্ধীজির শিবিরে জমা দিয়েছিলেন, কিন্তু নিজের মূল শক্তি ও অস্ত্র ভাণ্ডার গোপনই রেখেছিলেন।
৬. উত্তর-দাঙ্গা জীবন ও রাজনৈতিক দূরত্ব
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয় এবং বাংলা বিভক্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে থেকে যায়, যার পেছনে ১৯৪৭-এর প্রতিরোধ একটি বড় কারণ ছিল বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।
রাজনীতি থেকে দূরত্ব
স্বাধীনতার পর ভারতের মূলধারার রাজনীতিতে গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে যোগ্য সম্মান বা স্থান দেওয়া হয়নি। এর প্রধান কারণ ছিল কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং গোপালচন্দ্রের গায়ে লেগে থাকা ‘দাঙ্গাবাজ’ বা ‘ডানপন্থী’ তকমা। গোপালচন্দ্র নিজেও কখনো ক্ষমতার লোভ করেননি বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ দেখাননি।
তিনি পুনরায় তাঁর পারিবারিক ব্যবসায় মন দেন। তবে কলকাতার সমাজজীবনে তাঁর প্রভাব আজীবন অক্ষুণ্ণ ছিল। বউবাজার এলাকায় যেকোনো সামাজিক সমস্যা, গরিবের মেয়ের বিয়ে বা পাড়ার ক্লাবগুলোর যেকোনো প্রয়োজনে তিনি অর্থ ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। উগ্রতা ছেড়ে তিনি শান্ত ও গম্ভীর এক অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন।
৭. মূল্যায়ন ও বিতর্ক
ইতিহাসের পাতায় গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় বা গোপাল পাঁঠা একটি দ্বিমুখী চরিত্রের নাম। তাঁকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ইতিহাসবিদদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যায়।
১. বীর ও ত্রাতা হিসেবে (The Savior)
ডানপন্থী এবং বহু বাঙালি হিন্দুর চোখে গোপাল পাঁঠা ছিলেন ‘কলকাতার ত্রাণকর্তা’। তাঁদের মতে, যদি ১৬ আগস্টের পর গোপালচন্দ্র পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে না তুলতেন, তবে হয়তো আজ কলকাতা ভারতের মানচিত্রে থাকত না। সুহরাওয়ার্দীর পরিকল্পনা অনুযায়ী সমগ্র কলকাতা হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অংশ হয়ে যেত। তিনি মূলত আত্মরক্ষার স্বার্থে এবং নিজ সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব রক্ষায় অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন।
২. উগ্রপন্থী বা অপরাধী হিসেবে (The Rioter)
অন্যদিকে, বামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিকদের একাংশ তাঁকে একজন ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন’ বা ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে দেখেন। তাঁদের মতে, সহিংসতার উত্তর সহিংসতা দিয়ে দেওয়া কখনো ন্যায়সংগত হতে পারে না। গোপালচন্দ্রের বাহিনীর পাল্টা হামলায় বহু নিরীহ মুসলিমও প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা দাঙ্গার আগুনকে আরও উসকে দিয়েছিল।
৮. মৃত্যু ওlegacy
দীর্ঘদিন প্রচারের আড়ালে থাকার পর, ২০০৫ সালের ৫ মে এই ঐতিহাসিক ও বিতর্কিত চরিত্রের জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৯২ বছর। কলকাতার বউবাজারের সাধারণ মানুষ আজও তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারনেটের প্রসার এবং ইতিহাসের পুনঃমূল্যায়নের যুগে গোপাল পাঁঠার নাম আবার নতুন করে চর্চায় এসেছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্লগে ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গায় তাঁর ভূমিকাকে বীরত্বগাথা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
উপসংহার
গোপালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় কোনো সাধু বা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ছিলেন না। তিনি ছিলেন পরিস্থিতির তৈরি করা এক নায়ক বা খলনায়ক (দৃষ্টিকোণ ভেদে)। যখন রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং পুলিশ যখন নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন কলকাতার সাধারণ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। সেই চরম মুহূর্তে গোপাল পাঁঠা যা করেছিলেন, তা ছিল আদিম ও বাস্তবসম্মত আত্মরক্ষা। ভালো বা মন্দ—যেকোনো বিশেষণেই তাঁকে ভূষিত করা হোক না কেন, আধুনিক কলকাতার ভৌগোলিক ও সামাজিক মানচিত্র গঠনে তাঁর অবদানকে ইতিহাস কোনোভাবেই মুছে ফেলতে পারবে না।